সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

কুরআনও সহীহ সুননাহ-প্রচার


 يَٰٓأَيُّهَا ٱلرَّسُولُ بَلِّغْ مَآ أُنزِلَ إِلَيْكَ مِن رَّبِّكَۖ وَإِن لَّمْ تَفْعَلْ فَمَا بَلَّغْتَ رِسَالَتَهُۥۚ وَٱللَّهُ يَعْصِمُكَ مِنَ ٱلنَّاسِۗ إِنَّ ٱللَّهَ لَا يَهْدِى ٱلْقَوْمَ ٱلْكَٰفِرِينَ 


হে রাসূল! আপনার রবের কাছ থেকে আপনার প্রতি যা নাযিল হয়েছে তা প্রচার করুন; যদি না করেন তবে তো আপনি তাঁর বার্তা প্রচার করলেন না [১]। আর আল্লাহ আপনাকে মানুষ থেকে রক্ষা করবেন [২]। নিশ্চয় আল্লাহ কাফের সম্প্রদায়কে হেদায়াত করেন না। 

দশম রুকূ

[১] এ আয়াতে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রচারকার্যের তাগিদ ও তার প্রতি সান্তুনা দেয়া হচ্ছে, যাতে করে তিনি নিরাশ কিংবা প্রচারকার্যে নিরুৎসাহিত না হন। বলা হচ্ছে যে, আপনার প্রতি আল্লাহর পক্ষ থেকে যা কিছু নাযিল করা হয়েছে তা সম্পূর্ণটিই বিনা দ্বিধায় মানুষের কাছে পৌঁছে দিন; কেউ মন্দ বলুক অথবা ভাল, বিরোধিতা করুক কিংবা গ্রহণ করুক। অপরদিকে তাকে এ সংবাদ দিয়ে আশ্বস্ত করা হয়েছে যে, প্রচারকার্যে কাফেররা আপনার কোন ক্ষতি করতে পারবে না। আল্লাহ্ তা’আলা স্বয়ং আপনার দেখাশুনা করবেন। আয়াতের উদ্দেশ্য এই যে, যদি আপনি আল্লাহ্ তা’আলার একটি নির্দেশও পৌঁছাতে বাকী রাখেন, তবে আপনি নবুয়তের দায়িত্ব থেকে পরিত্রাণ পাবেন না। এ কারণেই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম আজীবন এ কর্তব্য পালনে পূর্ণ সাহসিকতা ও সর্বশক্তি নিয়োগ করেন। বিদায় হজে তিনি সাহাবায়ে কেরামের অভূতপূর্ব সমাবেশকে লক্ষ্য করে গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশ জারি করার পর প্রশ্ন করলেনঃ ‘শুন, আমি কি তোমাদের কাছে দ্বীন পৌঁছে দিয়েছি?’ সাহাবীগণ স্বীকার করলেন, “জী হ্যাঁ, অবশ্যই পৌঁছে দিয়েছেন।’ এরপর রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ তোমরা এ বিষয়ে সাক্ষী থেকো। তিনি আরো বললেন, ‘এ সমাবেশে যারা উপস্থিত আছ, তারা আমার কথাটি অনুপস্থিতদের কাছে পৌছে দেবে।’ [বুখারী ৪১৪১, ৩২৬৬]


অন্য এক হাদীসে আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা বলেন, যে ব্যক্তি মনে করে যে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের উপর যা কিছু নাযিল হয়েছে তিনি তার কিছু অংশ গোপন করেছেন, সে মিথ্যা বলেছে। [বুখারী ৪৬১২]


আল্লামা শানকীতী বলেন, এ আয়াত ও অনুরূপ আয়াত থেকে বুঝা যাচ্ছে যে, রাসূলের দায়িত্ব শুধু প্রচার করা। আর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম এ দায়িত্ব যথাযথই পালন করেছেন। এ জন্যে আল্লাহ বলেন, “কাজেই আপনি তাদেরকে উপেক্ষা করুন, এতে আপনি তিরস্কৃত হবেন না”। [সূরা আয-যারিয়াত: ৫৪] 


সুতরাং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার উপর অর্পিত দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করেছেন। কোন কিছুই গোপন করেন নি। [আদওয়াউল বায়ান] হাদীসে এসেছে, আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা বলেন, যে কেউ তোমাকে বলবে যে, মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার নিকট যা নাযিল করা হয়েছে তার কোন অংশ গোপন করেছেন, তাহলে মিথ্যা বলেছে। কারণ, আল্লাহ বলেন, “হে রাসূল! আপনার রবের কাছ থেকে আপনার প্রতি যা নাযিল হয়েছে তা প্রচার করুন; যদি না করেন তবে তো আপনি তার বার্তা প্রচার করলেন না”। [বুখারী: ৪৬১২]


[২] আয়াতের এ বাক্যে সুসংবাদ দেয়া হয়েছে, যে যত বিরোধিতাই করুক, শক্ররা আপনার কেশাগ্রও স্পর্শ করতে পারবে না। হাদীসে বলা হয়েছে, এ আয়াত নাযিল হওয়ার পূর্বে কয়েকজন সাহাবী দেহরক্ষী হিসাবে সাধারণভাবে মহানবী সাল্লাল্লাহু '‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে থাকতেন এবং গৃহে ও প্রবাসে তাকে প্রহরা দিতেন। এ আয়াত নাযিল হওয়ার পর তিনি সবাইকে বিদায় করে দেন। [দেখুন- তিরমিয়ী, ৩০৪৬]


কারণ, এ দায়িত্ব আল্লাহ্ তা’আলা স্বহস্তে গ্রহণ করেন। এ আয়াত নাযিল হওয়ার পর প্রচারকার্যে কেউ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের বিন্দুমাত্রও ক্ষতি করতে সক্ষম হয়নি। অবশ্য যুদ্ধ ও জিহাদে সাময়িকভাবে কোনরূপ কষ্ট পাওয়া এর পরিপন্থী নয়। তাছাড়া কোন কোন হাদীসে এ হিফাযতের বাস্তব নমূনাও আমরা দেখতে পাই। জাবের ইবনে আব্দুল্লাহ বলেন, আমরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সাথে নাজদের পথে যুদ্ধে বের হলাম। একটি ঘন বৃক্ষ সম্পন্ন উপত্যকায় পৌঁছে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার তরবারটি একটি গাছের সাথে ঝুলিয়ে রেখে আরাম করছিলেন। সাহাবায়ে কিরাম ছায়ার আশায় বিভিন্ন দিকে বিক্ষিপ্ত ঘুরাফেরা করছিল। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, একটি লোক এসে আমার ঘুমন্ত অবস্থার সুযোগে আমার তরবারটি হাতে নিল। আমি জাগ্রত হয়ে দেখলাম যে, লোকটি আমার মাথার উপর উন্মুক্ত অসি নিয়ে বলছে, তোমাকে আমার হাত থেকে কে রক্ষা করবে? আমি বললাম, আল্লাহ। লোকটি দ্বিতীয়বার আমাকে বলল, তোমাকে আমার হাত হতে কে রক্ষা করবে? আমি বললাম, আল্লাহ। আর তখনি তরবারী পড়ে গেল। আর সে হচ্ছে এই বসা লোকটি। তারপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে কিছু করলেন না। [মুসলিম:৮৪৩; অনুরূপ বুখারী: ২৯১০]

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

জান্নাতী, যারা জান্নাতের প্রবেশ করবে তাদের বৈশিষ্ট্য

জান্নাতীদের বৈশিষ্ট্য হলো তারা ধৈর্যশীল, সত্যবাদী, অনুগত, বিনয়াবনত, গোপন ও প্রকাশ্যে ব্যয়কারী, তাওবাকারী এবং শেষরাতে ক্ষমাপ্রার্থী; তারা তাকওয়া অবলম্বন করে চলে তারা বলে, “হে আমাদের রব্ব, আমরা ঈমান এনেছি, সুতরাং তুমি আমাদের পাপ ক্ষমা কর এবং আমাদিগকে আগুনের  আযাব থেকে রক্ষা কর”।  জান্নাতীদের অন্যতম বৈশিষ্ট্য এই যে তারা সালাত কায়েম করে, যাকাত দেয়, রসুলের প্রতি ঈমান আনে, রসুলদের প্রতি সম্মান করে, আল্লাহকে উত্তম ঋণ প্রদান করে এবং ভালর দ্বারা মন্দ দূরীভূত করে, আল্লাহই তাদের পাপ ক্ষমা করবেন এবং দাখিল করাবেন জান্নাতে।  রাসুলের প্রতি যা অবতীর্ণ হয়েছে তা যখন মু’মিনেরা শ্রবণ করে তখন তারা যে সত্য উপলদ্ধি করেছে তাতে তাদের চক্ষু বিগলিত হয়, তারা বলে, হে আমাদের রব্ব, আমরা ঈমান এনেছি, সুতরাং তুমি আমাদিগকে সাক্ষ্যবহদের মধ্যে তালিকাভুক্ত কর।  আমরা আল্লাহ, রাসুল ও আল-কুরআনে ঈমান এনেছি এবং আমরা প্রার্থনা করি, হে আল্লাহ, তুমি আমাদিগকে সৎকর্মপরায়ণদের অন্তর্ভুক্ত কর; এবং তাদের এই কথার জন্য আল্লাহ তাদের পুরস্কার হিসেবে নির্দিষ্ট করেছেন জান্নাত।  যারা ঈমান আনে, হিজরত করে এবং নিজেদের সম্প...

চোগলখোরের পরিচয় ও পরিণাম

অন্যের কাছে নিজেকে আপন করে তুলতে বা নিজের অবস্থান পাকাপোক্ত করতে বা দুনিয়াবী সুযোগ-সুবিধা লাভে কিংবা ব্যক্তি স্বার্থ চরিতার্থ করতে যে মানুষ একজনের কথা অন্যজনের কাছে বলে বেড়ায়; সে হচ্ছে চোগলখোর। ফেতনা-ফাসাদ ও অসন্তষ্টি সৃষ্টির লক্ষে একজনের কথা অন্যজনের কাছে বলে বেড়ানোই হচ্ছে চোগলখুরি। ইসলামে চোগলখুরিকে গোনাহের কাজ এবং হারাম হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। চোগলখুরীর কারণে মানুষের মাঝে ফেতনা সৃষ্টি হয়। পরস্পরের ভালো সম্পর্ক নষ্ট হয়ে যায়। পারস্পরিক দুশমনি বৃদ্ধি পায়। হিংসা-বিদ্বেষ ও শত্রুতা সৃষ্টি হয়। এ কারণেই চোগলখোর বেহেশতে প্রবেশ করতে পারবে না বলে ঘোষণা দিয়েছেন স্বয়ং প্রিয় নবি। চোগলখুরির পরিচয় হজরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, সাবধান! আমি তোমাদেরকে জানাচ্ছি চোগলখুরি কী? এ হচ্ছে কুৎসা রটনা করা; যাতে মানুষের মাঝে বৈরিতার সৃষ্টি হয়। তিনি আরো বলেছেন, কোনো ব্যক্তি সত্য কথা বলতে বলতে সত্যবাদী হিসেবে লিপিবদ্ধ হয়; আবার কেউ মিথ্যা বলতে বলতে মিথ্যাবাদী হিসেবে লিপিবদ্ধ হয়।’ কুরআনুল কারিমে আল্লাহ তাআলা চোগলখোরদের নিন্দা...

মহান আল্লাহ - তিনি বৈশিষ্ট্য মণ্ডিত সত্তা

সর্বোজ্ঞ-প্রজ্ঞাময় আল্লাহ কিয়ামতের দিন উপস্থিত হবেন এবং জান্নাতীদের সাথে কথা বলবেন; আল-কুরআন ও হাদীসে বর্ণিত আল্লাহর মুখ-চেহারা, হাত, পা, চোখ, কান, আঙ্গুল ও নাফস আছে; এসব তথ্যের উপর ভিত্তি করে মুসলিমদের একটি দল বিশ্বাস করেন, যেহেতু আল্লাহকে দেখা যাবে সেহেতু আল্লাহর একটি নির্দিষ্ট আকার (Size) আছে; তাদের মতে “আকারযুক্ত বস্তু দেখা যায় এবং নিরাকার বস্তু দেখ যায় না”। তারা বলেন যে, আল্লাহর এই আকার তাঁর মহান জাতসত্তা ও মহান মর্যাদার সাথে শোভনীয় এবং মানানসই; তারা আরো বলেন যে, আল্লাহর আকার তাঁর সৃষ্ট কোন বস্তুর আকার ও আকৃতির মত নয়। “নিরাকার কোন বস্তুকে দেখা যায় না” এই ধারণার উপর ভিত্তির করেই মুসলিমেদের এই দলটি “আল্লাহর আকার আছে” এই বিশ্বাস লালন করেন।  মুসলিমদের দ্বিতীয় দলটি মনে করেন যে “আল্লাহ নিরাকার অর্থাৎ আল্লাহর কোন আকার নেই”। আল্লাহর চেহারা-মুখ, হাত, পা, চোখ, কান, আঙ্গুল, নাফস ইত্যাদির যে বর্ণনা কুরআনে ও হাদীসে আছে তা মূলত আল্লাহর অনুপম শক্তির বহিঃপ্রকাশ। আল্লাহর অঙ্গ ও প্রত্যঙ্গের উল্লেখ করার সময় এই দ্বিতীয় দলটি এইভাবে বলেন যে, আল্লাহ‌র ক্বুদরতি হাত, ক্বুদরতি পা, ক্বুদরতি চোখ, ক্বুদরত...

নিজ ঘরে যে নামাজ আদায়ে রয়েছে কল্যাণ

  নামাজ ইসলামের অন্যতম প্রধান ইবাদত। ঈমানের পরেই যা পালনীয়। একজন মানুষের ঈমানের স্বীকৃতি দেয়ার পর প্রথম ইবাদত হলো নামাজ আদায় করা, যা ইসলামের দ্বিতীয় রোকন। কুরআন এবং হাদিসে একাধিকবার নামাজ আদায়ের নির্দেশ এবং ফজিলত বর্ণনা করা হয়েছে। মুসলিম উম্মাহর জন্য তা পালনে রয়েছে দুনিয়ার কল্যাণ এবং আখেরাতের মুক্তি। এ কারণে প্রিয়নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ফরজ নামাজ আদায়ের সঙ্গে সঙ্গে বেশি বেশি সুন্নত ও নফল নামাজ এবং এ নামাজের মাধ্যমে বেশি বেশি সেজদা আদায়ের নসিহত পেশ করেছেন। নামাজের জামাআতের ব্যাপারে রয়েছে জোর তাগিদ। আবার নফল ও সুন্নাত নামাজ নিজ ঘরে আদায়েরও রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ ফজিলত। দুনিয়ার কল্যাণ এবং পরকালের মুক্তিতে নফল নামাজ আদায়ের বিকল্প নেই। হাদিসে এসেছে- হজরত জাবের রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘তোমাদের কেউ যখন মসজিদে (ফরজ) নামাজ সম্পন্ন করে তখন তার উচিত সে যেন তার নামাজের কিছু অংশ (সুন্নাত নামাজ) নিজের বাড়ির জন্য রাখে। কারণ বাড়িতে আদায় করা কিছু নামাজের মধ্যে আল্লাহ তাআলা কল্যাণ নিহিত রেখেছেন।’ (মুসলিম) হজরত যায়েদ বিন সাবেত রাদিয়...