সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

আল-কুরআনে জাহান্নামের বর্ণনা

 


জাহান্নাম (الْجَهَنَّمُ) শব্দটি হিব্রু ভাষা থেকে গৃহীত; আবার কেউ-কেউ মনে করেন জাহান্নাম শব্দটি ফার্সি ভাষা থেকে উদ্ভুদ্ধ। জাহান্নামের অর্থ হলো দোযখ, নরক, আগুনের আধার। জাহান্নাম শব্দটি স্ত্রীলিঙ্গে মোট ৭৭ বার আল-কুরআনে ব্যবহৃত হয়েছে। 

 

আল্লাহ্‌ সুব্‌হানাহু ওয়া-তা’য়ালার বাণী: (وَالَّذِيۡنَ يَقُوۡلُوۡنَ رَبَّنَا اصۡرِفۡ عَنَّا عَذَابَ جَهَـنَّمَ ​ۖ اِنَّ عَذَابَهَا كَانَ غَرَامًا ​ۖ) এবং তারা বলে, “হে আমাদের রব্ব, আমাদের থেকে জাহান্নামের আযাব বিদুরিত করুন; এর আযাব তো নিশ্চিত বিনাশ’ (২৫:৬৫)। 

 

আল্লাহ্‌র বাণী: (وَاِذَا قِيۡلَ لَهُ اتَّقِ اللّٰهَ اَخَذَتۡهُ الۡعِزَّةُ بِالۡاِثۡمِ​ فَحَسۡبُهٗ جَهَنَّمُ​ؕ وَلَبِئۡسَ الۡمِهَادُ‏) যখন তাকে বলা হয়, ‘তুমি আল্লাহ্‌কে ভয় কর’ তখন তার আত্মাভিমান তাকে পাপানুষ্ঠানে লিপ্ত করে; সুতরাং জাহান্নামই তার জন্য যথেষ্ট; এবং নিশ্চয় জাহান্নাম অতি নিকৃষ্ট আবাস্থল (২:২০৬)। 

 

যারা শির্‌ক-কুফুরি করে, যুলুম-অত্যাচার করে, আল্লাহ্‌র নিদর্শনকে অস্বীকার করে, আল্লাহ্‌ সম্বন্ধে মিথ্যা রচনা করে আল্লাহ্‌র ক্রোধের পাত্র হয়, তাদের জন্য রয়েছে জাহান্নাম, আর জাহান্নাম অতি নিকৃষ্ট আবাস্থল।      


জাহান্নাম হল এমন একটি মহা-লাঞ্ছনার মহা-শাস্তির স্থান যা মানুষ ও জিন্ন দ্বারা পূর্ণ করা হবে; জাহান্নাম হল এমন একটি স্থান যেখানে রয়েছে প্রচণ্ড-প্রখর উত্তপ্ত অন্ধকার কালো আগুন, রয়েছে অত্যুষ্ণ বায়ু, রয়েছে কৃষ্ণবর্ণ ধূম্রের ছায়া, রয়েছে বিশাল বিশাল অগ্নি স্ফুলিংগ, রয়েছে সর্বদিক থেকে অগ্নির আচ্ছাদন ঊর্ধ্ব ও অধঃদেশ থেকে, রয়েছে দীর্ঘায়িত আগুনের স্তম্ভসমূহ।


জাহান্নামে রয়েছে আগুনের বেষ্টনী, রয়েছে জাহান্নামের বিকট শব্দ ক্রুদ্ধ গর্জন ও চিৎকার, রয়েছে আগুনের পোশাক আলকাতরা মিশ্রিত যা জ্বালিয়ে দেবে দেহের চামড়া এবং রয়েছে লেলিহান হুতামা যা জ্বালিয়ে দেবে অন্তরকে, এই জাহান্নামেই জাহান্নামীরা আস্বাদন করবে মহাঅগ্নির দহন যন্ত্রণা। সেখানে বিভৎস চেহারার জাহান্নামীরা ছুটাছুটি করবে অগ্নি ও ফুটন্ত পানির মধ্যে। 


জাহান্নামে রয়েছে পানীয় হিসেবে পান করার জন্য ফুটন্ত পানির নহর যার পানি গলিত ধাতুর ন্যায় এবং রয়েছে ফুটন্ত গলিত ক্ষতনিঃসৃত দূর্গন্ধেভরা পুঁজ, রক্ত ও স্রাবের নহর; থাকবে ফুটন্ত পানি সাথে পুঁজের মিশ্রণ; থাকবে সাপ, বিচ্ছু ও বিষাক্ত প্রাণীর লালা-মিশ্রিত বিষ। 


জাহান্নামে রয়েছে খাদ্য হিসেবে কন্টকময় গুল্ম ও কাঁটাযুক্ত যাক্কুম বৃক্ষ যা কখনই ক্ষুধা নিবারণ করবে না; দৈহিক-শারিরীক শাস্তির জন্য রয়েছে লৌহমুগুর, পাথর, উত্তপ্ত লোহার কাঁচি, লোহার শিকল-বেড়ি এবং লৌহশৃঙ্খল। জাহান্নামে রয়েছে বিশাল-বিশাল প্রান্তর, রয়েছে আগুন ও পুঁজ-নিঃসৃত গভীর উপত্যকা। 


জাহান্নমে রয়েছে আগুনের পর্বতমালা, রয়েছে অত্যাধিক গভীর বিষাদ কুয়া; রয়েছে সেখানে চিৎকার ও আর্তনাদ। জাহান্নামে রয়েছে শাস্তির দায়িত্বে নির্মমহৃদয় ও কঠোরস্বভাব ফিরিশতাগণ যারা আল্লাহ্‌র আদেশ পালনে সদা প্রস্তুত। 


যারা কুফুরী করেছে, যারা যুলুম করেছে, আল্লাহ্‌র নিদর্শনকে অস্বীকার করেছে, রাসুলদের মিথ্যা মনে করেছে, তাগূতকে অভিভাবক বানিয়েছে, যারা আল্লাহ্‌র পথ থেকে মানুষকে নিবৃত করেছে, তারাই হবে জাহান্নামের অধিবাসী। 


যারা আখিরাতকে অস্বীকার করেছে, শায়তানের একনিষ্ঠ অনুসরণকারী এবং যারা পাপিষ্ঠ-পথভ্রষ্ট-সত্যভ্রষ্ট-অভিসপ্ত, তারাই হবে জাহান্নামের অধিবাসী এবং তারাই হবে জাহান্নামের ইন্ধন; তারা সেখানে না মরবে, না সেখানে বাঁচবে। 

(সূত্র: আল-কুরআনুল কারীম) ৷


আল্লাহুম্মা সাল্লি, ওয়া সাল্লীম, ওয়া বারিক আ’লা মুহাম্মাদ; আল-হামদু লিল্লাহি রাব্বলি আ’লামীন। (চলবে-১)।

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

রাসূল (সা.) এর কবর যিয়ারত সম্পর্কিত যয়ীফ বা দুর্বল হাদীস

রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: ‘তিনটি মসজিদ ব্যতীত বরকতের আশায় অন্য কোনো স্থানের  উদ্দেশ্যে লম্বা সফর করা যাবে না, তিনটি মসজিদ হলো-(১) মসজদুল হারাম (মক্কা), (২) মসজিদূর রাসূল অর্থাৎ-মসজিদে নববী (মদীনা) এবং (৩) বায়তুল মুকাদ্দাস (জেরুযালেম)।’(সহিহ বুখারী-হা: ১১৮৯,সহিহ মুসলিম-হা: ১৩৯৭)।   যে সকল হাদীস দ্বারা রাসূলুল্লাহ (সা.) এর কবর যিয়ারত করার উদ্দেশ্যে লম্বা সফর বৈধ হওয়ার দলীল পেশ করা হয়, সে সকল হাদীসের বর্ণনাসূত্র দুর্বল ও মাওযূ বা বানোয়াট। হাফিজ দারাকুতনী, বায়হাক্বী, ইবনু হাজর প্রমুখ মুহাদ্দিস এই সব হাদীসসমূহের পরস্পর দুর্বল হওয়ার ব্যাপারে সতর্ক করে দিয়েছেন। সুতরাং উক্ত দুর্বল হাদীসগুলোকে সহিহ হাদীসের মোকাবিলায় পেশ করা বৈধ হবে না।    রাসুল (সা.) কবর জিয়ারত সম্পর্কিত বর্ণনাসূত্র যয়ীফ (দুর্বল) বা মাওদূ (জাল-বানোয়াট): এ বিষয়ে কতিপয় যয়ীফ ও মাওদূ হাদীস এখানে উল্লেখ করা হল যাতে পাঠকবৃন্দ সেগুলো জানতে পারেন ও ধোঁকা থেকে সতর্ক থাকেন।   প্রথম হাদীস: “যে আমার কবর যিয়ারত করবে, আমার শাফা’য়াত তার প্রাপ্য হবে”। দুটি সনদে এই হাদীসটি বর্ণিত হয়েছে। প্রথম সনদের রাবী অত্যন্ত দুর্বল, ...

দ্বীনে ইসলামীর সৌন্দর্য - 2

ঈমানের পরে ইসলামের বড় বড় বিধানসমূহ হল: সালাত (নামায) প্রতিষ্ঠা করা, যাকাত আদায় করা, রমযান মাসে সাওম (রোযা) পালন করা এবং সম্মানিত ঘরের হজ করা সে সম্পর্কে  শরীয়তের এই মহান বিধানসমূহ ও তার বিরাট উপকারিতা নিয়ে চিন্তাভাবনা করুন। এই বিধিবিধানের দাবিস্বরূপ আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য চেষ্টা-সাধনা করা ও এর প্রতিদানস্বরূপ ইহকালীন ও পরকালীন সফলতা নিয়েও চিন্তা করুন। ০ সালাতের মধ্যে যা আছে, তা নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করুন । এতে রয়েছে আল্লাহর জন্য ইখলাস তথা একনিষ্ঠতা, তার প্রতি পরিপূর্ণ মনোযোগ, প্রশংসা, দো‘আ ও প্রার্থনা, বিনয়। ঈমানের বৃক্ষের ক্ষেত্রে এর গুরুত্ব বাগিচার ক্ষেত্রে পানি সেচ দেয়ার মতোই । দিনে ও রাতে যদি বার বার সালাতের ব্যবস্থা না থাকত , তবে ঈমান-বৃক্ষ শুকিয়ে যেত এবং তার কাঠ বিবর্ণ হয়ে যেত; কিন্তু সালাতের বিভিন্ন ইবাদাতের কারণে ঈমান-বৃক্ষ বৃদ্ধি পায় এবং নতুনত্ব লাভ করে। এছাড়াও সালাতের অন্তর্ভুক্ত নানা বিষয়ের প্রতি লক্ষ্য করুন; যেমন: আল্লাহর যিকির ও স্মরণে মগ্ন থাকা— যা সব কিছুর চেয়ে মহান ও শ্রেষ্ঠ। কিংবা এ দিকে চিন্তা করুন: সালাত সকল প্রকার অশ্লীল ও অন্যায় কাজ থেকে বিরত রাখে। ০ এবা...

জান্নাতে প্রবেশের দৃশ্য এবং বিভিন্ন মর্যাদার দরজা (বাব)

যারা তাদের রব্বকে ভয় করত তাদেরকে দলেদলে জান্নাতের দিকে নিয়ে যাওয়া হবে। যখন তারা জান্নাতের নিকট উপস্থিত হবে তখন এর দ্বারসমূহ খুলে দেওয়া হবে। জান্নাতের দ্বাররক্ষীরা বলবে তোমাদের প্রতি সালাম, তোমরা সুখী হও এবং জান্নাতে প্রবেশ কর স্থায়ীভাবে। (৩৯:৭৩) যখন জান্নাতে প্রবেশ করবে তখন মু’মিন-মুত্তাকীরা বলবে, “প্রশংসা আল্লাহর, যিনি আমাদের প্রতি তাঁর অঙ্গীকার ও প্রতিশ্রুতি পূর্ণ করেছেন এবং আমাদেরকে অধিকারী করিয়েছেন এই ভূমির; আমরা জান্নাতে যেথায় ইচ্ছা বসবাস করব; সদাচারীদের পুরস্কার কত উত্তম” (৩৯:৭৪)।  এছাড়া বিভিন্ন হাদীসগ্রন্থে বর্ণিত জান্নাতের বিভিন্ন দরজার (গেট বা বাবের) যে  উল্লেখ পাওয়া যায় তা বিশেষ গুরুত্বের দাবি রাখে, সেই সাথে এসকল গেটগুলি বান্দার জন্য মর্যাদার বিশেষ প্রতীকও বটে। যেমন:  (১) বাব-আস সালাহ দিয়ে সালাত আদায়ে তৎপর মু’মিন-মুত্তাকীরা প্রবেশ করবে, (২) বাব-আল জিহাদ দিয়ে দুনিয়ার জীবনে জিহাদে অংশগ্রহণকরীগণ জান্নাতে প্রবেশ করবে, (৩) বাব-আস সাদাক্বাহ দিয়ে ঐসব ব্যক্তিবর্গ প্রবেশ করবে যারা দুনিয়াতে বেশী-বেশী দান ও সাদাক্বাহ করেছে, (৪) বাব-আর রাইয়ান তাদের জন্য নির্দিষ্ট যারা নিয়ম...

আল্লাহ তা‘আলার হক বা প্রাপ্য - পর্ব-১

আল্লাহ তা ‘ আলা স্বীয় বান্দাদের জলে-স্থলে, শরীরে ও দিগন্ত জুড়ে প্রকাশ্য-অপ্রকাশ্য নি‘আমতরাজি দ্বারা আবৃত করে রেখেছেন। তিনি বলেন, ﴿ أَلَمۡ تَرَوۡاْ أَنَّ ٱللَّهَ سَخَّرَ لَكُم مَّا فِي ٱلسَّمَٰوَٰتِ وَمَا فِي ٱلۡأَرۡضِ وَأَسۡبَغَ عَلَيۡكُمۡ نِعَمَهُۥ ظَٰهِرَةٗ وَبَاطِنَةٗ ﴾ [لقمان: ٢٠] “তোমরা কি দেখ না আল্লাহ তা ‘ আলা নভোমণ্ডল ও ভূ-মণ্ডলে যা কিছু আছে, সবই তোমাদের কাজে নিয়োজিত করে দিয়েছেন এবং তোমাদের প্রতি তার প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য নি‘আমতসমূহ পরিপূর্ণ করে দিয়েছেন ?” [সূরা লুকমান, আয়াত: ২০] অন্যত্র বলেন , ﴿ وَءَاتَىٰكُم مِّن كُلِّ مَا سَأَلۡتُمُوهُۚ وَإِن تَعُدُّواْ نِعۡمَتَ ٱللَّهِ لَا تُحۡصُوهَآۗ إِنَّ ٱلۡإِنسَٰنَ لَظَلُومٞ كَفَّارٞ ٣٤ ﴾ [ابراهيم: ٣٤] “যে সকল বস্তু তোমরা চেয়েছ, তার প্রত্যেকটি-ই তিনি তোমাদেরকে দিয়েছেন। যদি আল্লাহর নি‘আমত গণনা কর, তবে গুণে শেষ করতে পারবে না। আফসোস! মানুষ সীমাহীন অন্যায়পরায়ণ, অকৃতজ্ঞ।” [সূরা ইবরাহীম, আয়াত: ৩৪] ﴿ وَإِن تَعُدُّواْ نِعۡمَةَ ٱللَّهِ لَا تُحۡصُوهَآۗ إِنَّ ٱللَّهَ لَغَفُورٞ رَّحِيمٞ ١٨ ﴾ [النحل: ١٨] “যদি আল্লাহর নি ‘ আমত গণনা কর, তবে গুণে শেষ ক...

শবে বরাত ও প্রাসঙ্গিক কিছু কথা

  শবে বরাতের আভিধানিক অর্থ অনুসন্ধান: শব ফারসি শব্দ । অর্থ রাত বা রজনী । বরাত শব্দটিও মূলে ফারসি । অর্থ ভাগ্য । দু’শব্দের একত্রে অর্থ হবে , ভাগ্য-রজনী । বরাত শব্দটি আরবী ভেবে অনেকেই ভুল করে থাকেন । কারণ বরাত বলতে আরবী ভাষায় কোনো শব্দ নেই । যদি বরাত শব্দটি আরবী বারাআত শব্দের অপভ্রংশ ধরা হয় তবে তার অর্থ   হবে — সম্পর্কচ্ছেদ বা বিমুক্তিকরণ । কিন্তু কয়েকটি কারণে এ অর্থটি এখানে অগ্রাহ্য , মেনে নেয়া যায় না- ১. আগের শব্দটি ফারসী হওয়ায় বরাত শব্দটিও ফারসী হবে , এটাই স্বাভাবিক । ২. শাবানের মধ্যরজনীকে আরবী ভাষার দীর্ঘ পরম্পরায় কেউই বারা‘আতের রাত্রি হিসাবে আখ্যা দেন নি । ৩. রমযান মাসের লাইলাতুল কাদরকে কেউ-কেউ লাইলাতুল বারা‘আত হিসেবে নামকরণ করেছেন , শাবানের মধ্যরজনীকে নয় । আরবী ভাষায় এ রাতটিকে কী বলা হয় ? আরবী ভাষায় এ রাতটিকে লাইলাতুন নিছফি মিন শাবান- শাবান মাসের মধ্য রজনী — হিসেবে অভিহিত করা হয় । শাবানের মধ্যরাত্রির কি কোনো ফযিলত বর্ণিত হয়েছে ? শাবান মাসের মধ্য রাত্রির ফযিলত সম্পর্কে কিছু হাদীস বর্ণিত হয়েছে: ১. আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা বলেন, ...