সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

রাসূল (সা.) এর কবর যিয়ারত সম্পর্কিত যয়ীফ বা দুর্বল হাদীস

রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: ‘তিনটি মসজিদ ব্যতীত বরকতের আশায় অন্য কোনো স্থানের  উদ্দেশ্যে লম্বা সফর করা যাবে না, তিনটি মসজিদ হলো-(১) মসজদুল হারাম (মক্কা), (২) মসজিদূর রাসূল অর্থাৎ-মসজিদে নববী (মদীনা) এবং (৩) বায়তুল মুকাদ্দাস (জেরুযালেম)।’(সহিহ বুখারী-হা: ১১৮৯,সহিহ মুসলিম-হা: ১৩৯৭)।

 

যে সকল হাদীস দ্বারা রাসূলুল্লাহ (সা.) এর কবর যিয়ারত করার উদ্দেশ্যে লম্বা সফর বৈধ হওয়ার দলীল পেশ করা হয়, সে সকল হাদীসের বর্ণনাসূত্র দুর্বল ও মাওযূ বা বানোয়াট। হাফিজ দারাকুতনী, বায়হাক্বী, ইবনু হাজর প্রমুখ মুহাদ্দিস এই সব হাদীসসমূহের পরস্পর দুর্বল হওয়ার ব্যাপারে সতর্ক করে দিয়েছেন। সুতরাং উক্ত দুর্বল হাদীসগুলোকে সহিহ হাদীসের মোকাবিলায় পেশ করা বৈধ হবে না। 

 

রাসুল (সা.) কবর জিয়ারত সম্পর্কিত বর্ণনাসূত্র যয়ীফ (দুর্বল) বা মাওদূ (জাল-বানোয়াট): এ বিষয়ে কতিপয় যয়ীফ ও মাওদূ হাদীস এখানে উল্লেখ করা হল যাতে পাঠকবৃন্দ সেগুলো জানতে পারেন ও ধোঁকা থেকে সতর্ক থাকেন।

 

প্রথম হাদীস: “যে আমার কবর যিয়ারত করবে, আমার শাফা’য়াত তার প্রাপ্য হবে”। দুটি সনদে এই হাদীসটি বর্ণিত হয়েছে। প্রথম সনদের রাবী অত্যন্ত দুর্বল, তিনি মিথ্যা হাদীস বর্ণনাকারী হিসেবে চিহ্নিত এবং তিনি হাদীস জালিয়াতির দোষে দুষ্ট। দ্বিতীয় হাদীসের সনদটি সর্বাবস্থায় দুর্বল হিসেবে মুহাদ্দিসগণ রায় দিয়েছেন। সুতরাং এই হাদীসে মান “যয়ীফ”।

 

দ্বিতীয় হাদীস: “যে ব্যক্তি আমার কবর যিয়ারত করবে, অথবা তিনি বলেন, যে ব্যক্তি আমার যিয়ারত করবে, ক্বিয়ামতের দিন আমি তার জন্য শাফা’য়াতকারী  অথবা সাক্ষ্যদানকারী হব”। এই হাদীসের একজন রাবী অজ্ঞাত পরিচয় বর্ণনাকারী; রিজাল শাস্ত্রের কোন গ্রন্থে তার নাম উল্লেখ পাওয়া যায় না। ফলে এই হাদীসের সনদ অজ্ঞাত। সুতরাং এই হাদীসের মান মাওদু। 

 

তৃতীয় হাদীস:“যে ব্যক্তি ইচ্ছাপূর্বক আমার যিয়ারত করবে, ক্বিয়ামতের দিন সে আমার প্রতিবেশী হবে বা আমার আশ্রয়ে থাকবে”। এই হাদীসের সনদ অত্যন্ত দুর্বল। এই হাদীসে একজন রাবীর সঠিক পরিচয় জানা যায় নি; ইমাম বুখারীর মতে এই ব্যক্তির বর্ণিত হাদীস ভিত্তিহীন; কেউ বলেছেন এ ব্যক্তি পরিত্যাক্ত। দ্বিতীয় সনদে সাহাবি (রা.)-এর নাম উল্লেখ করা হয় নি, ফলে সনদটি মুরসাল বা বিচ্ছিন। সুতরাং এই হাদীসে মান “যয়ীফ”। 

 

চতুর্থ হাদীস: “যে ব্যক্তি আমার কাছে যিয়ারতকারী হিসেবে আগমন করবে, আমার যিয়ারত ছাড়া অন্য কোনো প্রয়োজন তাকে ধাবিত করবে না, তার জন্য আমার দায়িত্ব হবে যে, আমি ক্বিয়ামতের দিন তার জন্য শাফা’য়াত করব”। এ হাদীসের কোনো একজন রাবী দুর্বল, অনির্ভরযোগ্য এবং বিশ্বস্ত নয়। সুতরাং এই হাদীসে মান “যয়ীফ”।

 

পঞ্চম হাদীস:“যে ব্যক্তি সাওয়াবের উদ্দেশ্যে মদীনায় আমার সাথে সাক্ষাত করবে, ক্বিয়ামতের দিন আমি তার সাক্ষী এবং শাফা’য়াতকারী হব”। মুহাদ্দিসগণের গবেষণায় একজন রাবী দুর্বল চিহ্নিত হয়েছে। আর একজন রাবী হাদীস বর্ণনায় শক্তিশালী ছিলেন না এবং তিনি আপত্তিকর হাদীস বর্ণনা করতেন। এছাড়া হাদীসটির সনদ বিচ্ছিন্ন বা মুনকাতি। সুতরাং এই হাদীসে মান “যয়ীফ”।

 

ষষ্ঠ হাদীস: “আল্লাহ রহমত করুন সে ব্যক্তিকে, যে তার উটের রশি তার হাতে নিয়ে আমার যিয়ারত করেছে”। মুহাদ্দিসদের গবেষণায় সর্বসম্মতিক্রমে এই বাক্যটি ভিত্তিহীন বানোয়াট।

 

এ হাদীসগুলোর সবগুলোর সনদই দুর্বল। মুহাদ্দিসগণ এ অর্থের হাদীসগুলোকে একাবারেই ভিত্তিহীন বলে গণ্য করেছেন। আলবানী (রাহি.) একে যয়ীফ বা দুর্বল বলে উল্লেখ করেছেন। তবে গবেষণায় দেখা যায় যে, ১ম, ৪র্থ, ৫ম হাদীসের সনদে কোনো মিথ্যাবাদী বা একেবারে মাজহুল বা অজ্ঞাতনামা কেউ নেই। কাজেই এই সনদ্গুলো পরস্পরের শক্তি বৃদ্ধি করে এবং একাদিক সনদের কারণে গ্রহণযোগ্যতা লাভ করে। 

 

সপ্তম হাদীস: “যে ব্যক্তি হাজ্জ করে আমার মৃত্যুর পরে আমার কবর জিয়ারত করল, সে যেন আমার জীবদ্দশাতেই আমার যিয়ারত করল”। এই হাদীসের একজন রাবী অত্যন্ত দুর্বল, তিনি হাদীস বর্ণনায় ভুল করতেন। ইমাম বুখারী তাকে পরিত্যক্ত বলে উল্লেখ করেন। কোন কোন মুহাদ্দিস এই রাবীকে মিথ্যা হাদীস বর্ণনাকারী হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

 

অষ্টম হাদীস: আমার মৃত্যুর পরে আমার কবর যিয়ারত করল, সে যেন আমার জীবদ্দশায় আমার যিয়ারত করল”। এ সনদের প্রায় সকল রাবীই অজ্ঞাত পরিচয় বা দুর্বল। এই সনদের একজন রাবীকে মিথ্যাবাদী বলে উল্লেখ করেছেন। এই হাদীসটির সনদ একেবারেই অগ্রহণযোগ্য। 

 

নবম হাদীস: “যে ব্যক্তি হাজ্জ করল অথচ আমার জিয়ারত করল না সে আমার সঙ্গে খারাপ আচরণ করল”। এই কথাগুলো হাদীস হিসেবে কোনো মুহাদ্দিস কোনো হাদীস গ্রন্থে সংকলন করেন নি। এই হাদীসের দু’জন রাবী অত্যন্ত দুর্বল ও মিথ্যা হাদীস বর্ণনায় অভিযুক্ত।   

রেফারেন্স: প্রফেসর ড. খোন্দকার আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গীর (রাহি.) – হাদীসের নামে জালিয়াতি: প্রচলিত মিথ্যা হাদীস ও ভিত্তিহীন কথা। পঞ্চম সংস্করণ, এপ্রিল-২০১৭; আস-সুন্নাহ পাবলিকেশন্স; পৃষ্ঠা: ৫৭৮-৫৯১

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

দ্বীনে ইসলামীর সৌন্দর্য - 2

ঈমানের পরে ইসলামের বড় বড় বিধানসমূহ হল: সালাত (নামায) প্রতিষ্ঠা করা, যাকাত আদায় করা, রমযান মাসে সাওম (রোযা) পালন করা এবং সম্মানিত ঘরের হজ করা সে সম্পর্কে  শরীয়তের এই মহান বিধানসমূহ ও তার বিরাট উপকারিতা নিয়ে চিন্তাভাবনা করুন। এই বিধিবিধানের দাবিস্বরূপ আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য চেষ্টা-সাধনা করা ও এর প্রতিদানস্বরূপ ইহকালীন ও পরকালীন সফলতা নিয়েও চিন্তা করুন। ০ সালাতের মধ্যে যা আছে, তা নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করুন । এতে রয়েছে আল্লাহর জন্য ইখলাস তথা একনিষ্ঠতা, তার প্রতি পরিপূর্ণ মনোযোগ, প্রশংসা, দো‘আ ও প্রার্থনা, বিনয়। ঈমানের বৃক্ষের ক্ষেত্রে এর গুরুত্ব বাগিচার ক্ষেত্রে পানি সেচ দেয়ার মতোই । দিনে ও রাতে যদি বার বার সালাতের ব্যবস্থা না থাকত , তবে ঈমান-বৃক্ষ শুকিয়ে যেত এবং তার কাঠ বিবর্ণ হয়ে যেত; কিন্তু সালাতের বিভিন্ন ইবাদাতের কারণে ঈমান-বৃক্ষ বৃদ্ধি পায় এবং নতুনত্ব লাভ করে। এছাড়াও সালাতের অন্তর্ভুক্ত নানা বিষয়ের প্রতি লক্ষ্য করুন; যেমন: আল্লাহর যিকির ও স্মরণে মগ্ন থাকা— যা সব কিছুর চেয়ে মহান ও শ্রেষ্ঠ। কিংবা এ দিকে চিন্তা করুন: সালাত সকল প্রকার অশ্লীল ও অন্যায় কাজ থেকে বিরত রাখে। ০ এবা...