সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

ইফতারের সুন্নতি পদ্ধতি এবং এ সংক্রান্ত ১০টি নির্দেশনা:


সারাদিন রোজা থাকার পরে ইফতার করা মুমিনদের জন্য একটি বিরাট আনন্দের বিষয় তো বটেই বরং একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদতও। কিন্তু অনেক মুসলিম ইফতারের সঠিক নিয়ম-পদ্ধতি না জানার কারণে বিভিন্ন ধরণের সুন্নত পরিপন্থী কার্যক্রম করে থাকে।

তাই নিম্নে ইফতারের সুন্নাহ সম্মত পদ্ধতি এবং এ সংক্রান্ত প্রয়োজনীয় কিছু গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা প্রদান করা হলো:

◈ ১) সূর্য ডোবার সাথে সাথে ইফতার করা। ইচ্ছাকৃত ভাবে বিলম্ব না করা।

কিছু মানুষ সূর্য ডোবার ব্যাপারে নিশ্চিত হওয়ার পরও অতিরিক্ত সতর্কতার জন্য ৪/৫ মিনিট বিলম্ব করে। কিছু মানুষ আজান শেষ হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করে। নি:সন্দেহে এগুলো সুন্নত পরিপন্থী ও দীনের মধ্যে বাড়াবাড়ি।

◈ ২) ইফতারের পূর্বে আল্লাহর কাছে দুআ করা। সহিহ হাদিস দ্বারা সাব্যস্ত হয়েছে যে, রোজা অবস্থায় দুআ কবুল হয়। তাছাড়াও সহিহ হাদিসে ইফতারের আগে দুআ কবুলে বিষয়টিও প্রমাণিত। সে সময় মানুষ এক দিকে রোজা অবস্থায় থাকে অন্য দিকে রোজার কারণে ক্ষুধার্ত, তৃষ্ণার্ত ও ক্লান্ত-শ্রান্ত থাকে। তাই এ অবস্থায় দুআ কবুলের অধিক আশা করা যায়। তবে প্রত্যেক রোজাদার নিজে নিজে দুআ করবে। এ ক্ষেত্রে সম্মিলিতভাবে দুআ করা বিদআত।

◈ ৩) আধা পাকা নরম খেজুর দ্বারা ইফতার করা। তা সম্ভব না হলে শুকনা খেজুর। তাও সম্ভব না হলে পানি দ্বারা ইফতার। এ তিনটির কোনটি না পেলে অন্য যে কোন হালাল খাদ্য-পানীয় দ্বারা ইফতার করা।

উল্লেখ্য যে, বাঙ্গালীর ইফতারে বুট-মুড়ি না থাকলেই নয়। এ ক্ষেত্রে অনেকে মুড়ির সাথে কাঁচা পিয়াজ মেশান। কিন্তু হাদিসে কাঁচা পেঁয়াজের দুর্গন্ধ সহকারে মসজিদে যেতে নিষেধ করা হয়েছে। তাই হয় কাঁচা পেয়াজ খাওয়া বাদ দিতে হবে অথবা আগুনে সিদ্ধ করে তার দুর্গন্ধ দূর করতে হবে অথবা সালাতে যাওয়ার পূর্বে ভালভাবে ব্রাশ করে মুখ পরিষ্কার করতে হবে।

◈ ৪) ইফতারের শুরুতে ‘বিসমিল্লাহ’ (আল্লাহর নামে শুরু করছি) পাঠ করা (পরিপূর্ণ ‘বিসমিল্লাহির রহমানির রহীম’ নয়)।

উল্লেখ্য যে, আমাদের সমাজে ইফতারের জন্য বিশেষ একটি দুআ প্রচলিত রয়েছে। তাহলো, “আল্লাহুম্মা লাকা সুমতু ওয়ালা রিযক্বিকা আফত্বারতু”।

অর্থ: হে আল্লাহ্, আমি আপনার জন্য রোজা রেখেছি এবং আপনার দেওয়া রিজিক দিয়ে ইফতার করছি।) কিন্তু এ হাদিসটি সনদ গতভাবে জঈফ (দুর্বল)[দ্র: জঈফ আবু দাউদ, হা/২৩৫৮]। তাই তা না পড়াই ভালো। বরং অন্যান্য খাবার গ্রহণের সময় ‘বিসমিল্লাহ’ পাঠ করা বিশুদ্ধ হাদিস দ্বারা প্রমাণিত। তাই এখানেও তাই যথেষ্ট। তবে কেউ উক্ত দুআ পাঠ করলে তাকে বিদআত বলা ঠিক নয়।

◈ ৫) ইফতারের সময় সাধারণত মাগরিবের আজান হয়। তাই খাওয়া-দাওয়া চলাকালীন সময়েও আজানের জবাব দেওয়া ও আজানের পরের দরুদ ও দুআ পড়া।

◈ ৬) ইফতারের সময় বা ইফতার শেষে “যাহাবায যামাউ, ওয়াব তাল্লাতিল উরূক্বু ও ছাবাতাল আজরু ইনশাআল্লাহ্‌।” (অর্থ: তৃষ্ণা দূর হয়ে গেল, শিরা-উপশিরা সিক্ত হল এবং ইনশাআল্লাহ্‌, সওয়াব সাব্যস্ত হল)” [শাইখ আলবানী সহিহ আবু দাউদ গ্রন্থে হাদিসটিকে হাসান আখ্যায়িত করেছেন]। (আল্লামা উসাইয়মীন রহ. এ দুআটি ইফতারের পরে পড়ার কথা বলেছেন)

◈ ৭) পেট পুরে কিংবা মাত্রাতিরিক্ত না খাওয়া। হাদিসে পেট ভরে খাওয়াকে নিরুৎসাহিত করা হয়েছে। সুতরাং সেহেরি, ইফতার বা অন্য কখনোই পেট ভরে বা মাত্রাতিরিক্ত খাবার খাওয়া উচিৎ নয়। এটাই আধুনিক স্বাস্থ্য সম্মত খাদ্যনীতি।

◈ ৮) পানাহারে অপচয় রোধ করা জরুরি। কিছু মানুষ ইফতারে মাত্রাতিরিক্ত পরিমাণে খাদ্য ও পানীয়ের পসরা সাজায়। কিন্তু সামান্য কিছু খেয়ে বাকি খাবার ডাস্টবিনে নিক্ষেপ করে। এটি নি:সন্দেহে নিন্দনীয় ও গর্হিত কাজ।

◈ ৯) অন্য রোজাদারকে ইফতারি করানো। এতে উক্ত রোজাদারের সমপরিমাণ সওয়াব হবে। অর্থাৎ এক সাথে দুটি রোজার সওয়াব পেতে চাইলে আরেকজন রোজাদারকে ইফতার করান। এভাবে যত বেশি রোজদারকে ইফতার করানো হবে ততটি সওয়াব আপনার আমলনামায় লেখা হবে। কিন্তু যারা ইফতার করবে তাদের সওয়াব হ্রাস করা হবে না।

◈ ১০) প্রতিবেশি ও গরিব-অসহায় মানুষের বাড়িতে ইফতার পাঠানো।

প্রতিবেশির বাড়িতে ইফতার পাঠালে পারস্পারিক ভালবাসা ও সুসম্পর্ক বৃদ্ধি পায়। আর গরীব-অসহায় মানুষের বাড়িতে ইফতার পাঠানোর মাধ্যমে তাদের মুখে হাসি ফোটানো হয়। যা অত্যন্ত সওয়াবের কাজ।

মহান আল্লাহ আমাদেরকে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য সুন্নাহ মোতাবেক রোজা পালনের তওফিক দান করুন। আমীন।

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

জান্নাতী, যারা জান্নাতের প্রবেশ করবে তাদের বৈশিষ্ট্য

জান্নাতীদের বৈশিষ্ট্য হলো তারা ধৈর্যশীল, সত্যবাদী, অনুগত, বিনয়াবনত, গোপন ও প্রকাশ্যে ব্যয়কারী, তাওবাকারী এবং শেষরাতে ক্ষমাপ্রার্থী; তারা তাকওয়া অবলম্বন করে চলে তারা বলে, “হে আমাদের রব্ব, আমরা ঈমান এনেছি, সুতরাং তুমি আমাদের পাপ ক্ষমা কর এবং আমাদিগকে আগুনের  আযাব থেকে রক্ষা কর”।  জান্নাতীদের অন্যতম বৈশিষ্ট্য এই যে তারা সালাত কায়েম করে, যাকাত দেয়, রসুলের প্রতি ঈমান আনে, রসুলদের প্রতি সম্মান করে, আল্লাহকে উত্তম ঋণ প্রদান করে এবং ভালর দ্বারা মন্দ দূরীভূত করে, আল্লাহই তাদের পাপ ক্ষমা করবেন এবং দাখিল করাবেন জান্নাতে।  রাসুলের প্রতি যা অবতীর্ণ হয়েছে তা যখন মু’মিনেরা শ্রবণ করে তখন তারা যে সত্য উপলদ্ধি করেছে তাতে তাদের চক্ষু বিগলিত হয়, তারা বলে, হে আমাদের রব্ব, আমরা ঈমান এনেছি, সুতরাং তুমি আমাদিগকে সাক্ষ্যবহদের মধ্যে তালিকাভুক্ত কর।  আমরা আল্লাহ, রাসুল ও আল-কুরআনে ঈমান এনেছি এবং আমরা প্রার্থনা করি, হে আল্লাহ, তুমি আমাদিগকে সৎকর্মপরায়ণদের অন্তর্ভুক্ত কর; এবং তাদের এই কথার জন্য আল্লাহ তাদের পুরস্কার হিসেবে নির্দিষ্ট করেছেন জান্নাত।  যারা ঈমান আনে, হিজরত করে এবং নিজেদের সম্প...

চোগলখোরের পরিচয় ও পরিণাম

অন্যের কাছে নিজেকে আপন করে তুলতে বা নিজের অবস্থান পাকাপোক্ত করতে বা দুনিয়াবী সুযোগ-সুবিধা লাভে কিংবা ব্যক্তি স্বার্থ চরিতার্থ করতে যে মানুষ একজনের কথা অন্যজনের কাছে বলে বেড়ায়; সে হচ্ছে চোগলখোর। ফেতনা-ফাসাদ ও অসন্তষ্টি সৃষ্টির লক্ষে একজনের কথা অন্যজনের কাছে বলে বেড়ানোই হচ্ছে চোগলখুরি। ইসলামে চোগলখুরিকে গোনাহের কাজ এবং হারাম হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। চোগলখুরীর কারণে মানুষের মাঝে ফেতনা সৃষ্টি হয়। পরস্পরের ভালো সম্পর্ক নষ্ট হয়ে যায়। পারস্পরিক দুশমনি বৃদ্ধি পায়। হিংসা-বিদ্বেষ ও শত্রুতা সৃষ্টি হয়। এ কারণেই চোগলখোর বেহেশতে প্রবেশ করতে পারবে না বলে ঘোষণা দিয়েছেন স্বয়ং প্রিয় নবি। চোগলখুরির পরিচয় হজরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, সাবধান! আমি তোমাদেরকে জানাচ্ছি চোগলখুরি কী? এ হচ্ছে কুৎসা রটনা করা; যাতে মানুষের মাঝে বৈরিতার সৃষ্টি হয়। তিনি আরো বলেছেন, কোনো ব্যক্তি সত্য কথা বলতে বলতে সত্যবাদী হিসেবে লিপিবদ্ধ হয়; আবার কেউ মিথ্যা বলতে বলতে মিথ্যাবাদী হিসেবে লিপিবদ্ধ হয়।’ কুরআনুল কারিমে আল্লাহ তাআলা চোগলখোরদের নিন্দা...

মহান আল্লাহ - তিনি বৈশিষ্ট্য মণ্ডিত সত্তা

সর্বোজ্ঞ-প্রজ্ঞাময় আল্লাহ কিয়ামতের দিন উপস্থিত হবেন এবং জান্নাতীদের সাথে কথা বলবেন; আল-কুরআন ও হাদীসে বর্ণিত আল্লাহর মুখ-চেহারা, হাত, পা, চোখ, কান, আঙ্গুল ও নাফস আছে; এসব তথ্যের উপর ভিত্তি করে মুসলিমদের একটি দল বিশ্বাস করেন, যেহেতু আল্লাহকে দেখা যাবে সেহেতু আল্লাহর একটি নির্দিষ্ট আকার (Size) আছে; তাদের মতে “আকারযুক্ত বস্তু দেখা যায় এবং নিরাকার বস্তু দেখ যায় না”। তারা বলেন যে, আল্লাহর এই আকার তাঁর মহান জাতসত্তা ও মহান মর্যাদার সাথে শোভনীয় এবং মানানসই; তারা আরো বলেন যে, আল্লাহর আকার তাঁর সৃষ্ট কোন বস্তুর আকার ও আকৃতির মত নয়। “নিরাকার কোন বস্তুকে দেখা যায় না” এই ধারণার উপর ভিত্তির করেই মুসলিমেদের এই দলটি “আল্লাহর আকার আছে” এই বিশ্বাস লালন করেন।  মুসলিমদের দ্বিতীয় দলটি মনে করেন যে “আল্লাহ নিরাকার অর্থাৎ আল্লাহর কোন আকার নেই”। আল্লাহর চেহারা-মুখ, হাত, পা, চোখ, কান, আঙ্গুল, নাফস ইত্যাদির যে বর্ণনা কুরআনে ও হাদীসে আছে তা মূলত আল্লাহর অনুপম শক্তির বহিঃপ্রকাশ। আল্লাহর অঙ্গ ও প্রত্যঙ্গের উল্লেখ করার সময় এই দ্বিতীয় দলটি এইভাবে বলেন যে, আল্লাহ‌র ক্বুদরতি হাত, ক্বুদরতি পা, ক্বুদরতি চোখ, ক্বুদরত...

নিজ ঘরে যে নামাজ আদায়ে রয়েছে কল্যাণ

  নামাজ ইসলামের অন্যতম প্রধান ইবাদত। ঈমানের পরেই যা পালনীয়। একজন মানুষের ঈমানের স্বীকৃতি দেয়ার পর প্রথম ইবাদত হলো নামাজ আদায় করা, যা ইসলামের দ্বিতীয় রোকন। কুরআন এবং হাদিসে একাধিকবার নামাজ আদায়ের নির্দেশ এবং ফজিলত বর্ণনা করা হয়েছে। মুসলিম উম্মাহর জন্য তা পালনে রয়েছে দুনিয়ার কল্যাণ এবং আখেরাতের মুক্তি। এ কারণে প্রিয়নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ফরজ নামাজ আদায়ের সঙ্গে সঙ্গে বেশি বেশি সুন্নত ও নফল নামাজ এবং এ নামাজের মাধ্যমে বেশি বেশি সেজদা আদায়ের নসিহত পেশ করেছেন। নামাজের জামাআতের ব্যাপারে রয়েছে জোর তাগিদ। আবার নফল ও সুন্নাত নামাজ নিজ ঘরে আদায়েরও রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ ফজিলত। দুনিয়ার কল্যাণ এবং পরকালের মুক্তিতে নফল নামাজ আদায়ের বিকল্প নেই। হাদিসে এসেছে- হজরত জাবের রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘তোমাদের কেউ যখন মসজিদে (ফরজ) নামাজ সম্পন্ন করে তখন তার উচিত সে যেন তার নামাজের কিছু অংশ (সুন্নাত নামাজ) নিজের বাড়ির জন্য রাখে। কারণ বাড়িতে আদায় করা কিছু নামাজের মধ্যে আল্লাহ তাআলা কল্যাণ নিহিত রেখেছেন।’ (মুসলিম) হজরত যায়েদ বিন সাবেত রাদিয়...