সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

চোগলখোরের পরিচয় ও পরিণাম

অন্যের কাছে নিজেকে আপন করে তুলতে বা নিজের অবস্থান পাকাপোক্ত করতে বা দুনিয়াবী সুযোগ-সুবিধা লাভে কিংবা ব্যক্তি স্বার্থ চরিতার্থ করতে যে মানুষ একজনের কথা অন্যজনের কাছে বলে বেড়ায়; সে হচ্ছে চোগলখোর।

ফেতনা-ফাসাদ ও অসন্তষ্টি সৃষ্টির লক্ষে একজনের কথা অন্যজনের কাছে বলে বেড়ানোই হচ্ছে চোগলখুরি। ইসলামে চোগলখুরিকে গোনাহের কাজ এবং হারাম হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

চোগলখুরীর কারণে মানুষের মাঝে ফেতনা সৃষ্টি হয়। পরস্পরের ভালো সম্পর্ক নষ্ট হয়ে যায়। পারস্পরিক দুশমনি বৃদ্ধি পায়। হিংসা-বিদ্বেষ ও শত্রুতা সৃষ্টি হয়। এ কারণেই চোগলখোর বেহেশতে প্রবেশ করতে পারবে না বলে ঘোষণা দিয়েছেন স্বয়ং প্রিয় নবি।

চোগলখুরির পরিচয়

হজরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, সাবধান! আমি তোমাদেরকে জানাচ্ছি চোগলখুরি কী? এ হচ্ছে কুৎসা রটনা করা; যাতে মানুষের মাঝে বৈরিতার সৃষ্টি হয়। তিনি আরো বলেছেন, কোনো ব্যক্তি সত্য কথা বলতে বলতে সত্যবাদী হিসেবে লিপিবদ্ধ হয়; আবার কেউ মিথ্যা বলতে বলতে মিথ্যাবাদী হিসেবে লিপিবদ্ধ হয়।’

কুরআনুল কারিমে আল্লাহ তাআলা চোগলখোরদের নিন্দা জানিয়েছেন। কুরআনের এ আয়াত থেকেও চোগলখোরের পরিচয় প্রকাশ পায়। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘এবং অনুসরণ কর না তার; যে কথায় কথায় শপথ করে, যে লাঞ্ছিত। পশ্চাতে নিন্দাকারী; যে একের কথা অপরের কাছে লাগিয়ে বেড়ায়।’ (সুরা ক্বালাম : আয়াত ১০-১১)

হাদিসের অন্য জায়গায় এসেছে, ‘কিয়ামতের দিন সবচেয়ে খারাপ লোকদের দলভুক্ত হিসেবে ঐ ব্যক্তিকে দেখতে পাবে; যে ছিল দু’মুখো- যে এক জনের কাছে এক কথা আরেক জনের কাছে আরেক কথা নিয়ে হাজির হত।’ (মুসলিম)

চোগলখোরের পরিণাম

চোগলখোরের পরিনাম ভয়াবহ। আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ঘোষণা করেছেন, ‘চোগলখোর ব্যক্তি জান্নাতে প্রবেশ করবে না।’ (বুখারি, মুসলিম ও মিশকাত)

হজরত ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম একদিন মদিনার একটি খেজুর বাগান দিয়ে যাচ্ছিলেন, সেখানে তিনি দুই ব্যক্তির আহাজারি শুনতে পেলেন। তখন তাদেরকে কবরে শাস্তি দেয়া হচ্ছিল। প্রিয়নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, ‘এ (ব্যক্তি) দু’জনকে বড় কোনো কারণে আযাব দেয়া হচ্ছে না; অবশ্য এগুলো কবিরা গোনাহ। তাদের একজন পেশাব থেকে পবিত্রতা অর্জন করত না; আর অন্যজন চোগলখুরি করে বেড়াত।’ (বুখারি, মুসলিম ও মিশকাত)

বর্তমান সময়ে চোগরখুরির মতো নিকৃষ্ট প্রক্রিয়ার কারণে পারিবারিক জীবনে স্বামী-স্ত্রীতে অশান্তি ও কলহ বিরাজ করছে। কর্মস্থলে কিংবা অফিসে কর্মী এবং দায়িত্বশীলদের মাঝে বিরূপ মনোভাবও তৈরি হচ্ছে এ চোগলখুরির কারণে।

যদিও চোগলখোর স্বামী/স্ত্রী, পরিবার বা অফিস-আদালতে সাময়িকভাবে তার কর্মকাণ্ডে কর্তাব্যক্তি বা দায়িত্বশীলদের কাছে আস্থা অর্জন করে থাকে মূলত তা ওই ব্যক্তির জন্য দুনিয়া এবং পরকালে মহাক্ষতির কারণ। দুনিয়াতে সে চোগলখোর হিসেবে হয় লাঞ্ছিত বা ধিকৃত আর পরকালে তার জন্য জান্নাত হারাম হয়ে যায়।

পরিশেষে...

চোগলখুরি করা হারাম এবং বড় গোনাহের কাজ। হাদিসের পরিভাষায়ও চোগলখুরি কবিরা গোনাহ এবং জান্নাতের অন্তরায়। ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রীয় জীবনের সব পর্যায়ে চোগলখুরি পরিহার করা প্রত্যেক মুসলমানের একান্ত কর্তব্য।

আল্লাহ তাআলা মুসলিম উম্মাহকে চোগলখুরির মতো ভয়াবহ অপরাধ থেকে হেফাজত করুন। ফেতনা-ফাসাদ সৃষ্টির উদ্দেশ্যে একজনের কথা অন্যজনের কাছে লাগানোর অভ্যাস থেকে মুক্ত থাকার তাওফিক দান করুন। কুরআন-সুন্নাহর বিধান মোতাবেক জীবন পরিচালনা করার তাওফিক দান করুন। আমিন।



মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

দ্বীনে ইসলামীর সৌন্দর্য - 2

ঈমানের পরে ইসলামের বড় বড় বিধানসমূহ হল: সালাত (নামায) প্রতিষ্ঠা করা, যাকাত আদায় করা, রমযান মাসে সাওম (রোযা) পালন করা এবং সম্মানিত ঘরের হজ করা সে সম্পর্কে  শরীয়তের এই মহান বিধানসমূহ ও তার বিরাট উপকারিতা নিয়ে চিন্তাভাবনা করুন। এই বিধিবিধানের দাবিস্বরূপ আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য চেষ্টা-সাধনা করা ও এর প্রতিদানস্বরূপ ইহকালীন ও পরকালীন সফলতা নিয়েও চিন্তা করুন। ০ সালাতের মধ্যে যা আছে, তা নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করুন । এতে রয়েছে আল্লাহর জন্য ইখলাস তথা একনিষ্ঠতা, তার প্রতি পরিপূর্ণ মনোযোগ, প্রশংসা, দো‘আ ও প্রার্থনা, বিনয়। ঈমানের বৃক্ষের ক্ষেত্রে এর গুরুত্ব বাগিচার ক্ষেত্রে পানি সেচ দেয়ার মতোই । দিনে ও রাতে যদি বার বার সালাতের ব্যবস্থা না থাকত , তবে ঈমান-বৃক্ষ শুকিয়ে যেত এবং তার কাঠ বিবর্ণ হয়ে যেত; কিন্তু সালাতের বিভিন্ন ইবাদাতের কারণে ঈমান-বৃক্ষ বৃদ্ধি পায় এবং নতুনত্ব লাভ করে। এছাড়াও সালাতের অন্তর্ভুক্ত নানা বিষয়ের প্রতি লক্ষ্য করুন; যেমন: আল্লাহর যিকির ও স্মরণে মগ্ন থাকা— যা সব কিছুর চেয়ে মহান ও শ্রেষ্ঠ। কিংবা এ দিকে চিন্তা করুন: সালাত সকল প্রকার অশ্লীল ও অন্যায় কাজ থেকে বিরত রাখে। ০ এবা...