সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

জাহান্নামীদের শাস্তির ধরণ, প্রকৃতি এবং ভীতি প্রদর্শন

 

যারা আল্লাহর আয়াত-নিদর্শনকে প্রত্যাখ্যান করেছে, তারাই হতভাগ্য জাহান্নামী, তাদের নেকীর পাল্লা হালকা হবে, তারা পরিবেষ্টিত হবে অবরুদ্ধ অগ্নিতে, তাদের স্থান হবে উত্তপ্ত অগ্নি হাবিয়া নামক জাহান্নামে। 

এই অপরাধীরা সেই দিন বিনিময় হিসাবে দিতে চাইবে তার সন্তান-সন্ততিকে, তার স্ত্রী-ভ্রাতাকে, তার জ্ঞাতি-গোষ্ঠিকে, যারা তাকে আশ্রয় দিত তাদেরকে, পৃথিবীর সকলকে যাতে এই মুক্তিপণ তাকে মুক্তি দেয়; কিন্তু লেলিহান অগ্নি তার গাত্র থেকে চর্ম খসিয়েই দিবে।

জাহান্নাম সেই ব্যক্তিকে ডাকবে যে সত্যের প্রতি পৃষ্ঠ প্রদর্শন করেছিল এবং সত্য থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিল। সেদিন আল্লাহ জাহান্নামকে জিজ্ঞাসা করবেন, ‘তুমি কি পূর্ণ হয়েছো’; জাহান্নাম বলবে, ‘আরও আছে কি’। 

সেখানে রয়েছে শৃঙ্খল, বেড়ি ও লেলিহান অগ্নি; সেখানে তাদের জন্য থাকবে ঊর্ধ্বদিকে অগ্নির আচ্ছাদন এবং নিম্নদিকেও অগ্নি আচ্ছাদন, নিশ্চয় জাহান্নাম ওঁৎ পেতে রয়েছে, সীমালংঘকারীদের জাহান্নাম হল প্রত্যাবর্তনস্থল।

জাহান্নামে তারা যুগযুগ ধরে অবস্থান করবে, সেখানে আস্বাদন করবে না শৈত্য, না কোন পানীয় ফুটন্ত, শুধুমাত্র পানি ও পুঁজ ব্যতীত; কন্টকময় গুল্ম হবে তাদের খাদ্য, যা তাদেরকে পুষ্ট করবে না এবং তাদের ক্ষুধা নিবৃত্তি করবে না।

আল্লাহ তাদেরকে নিক্ষেপ করবে ‘সাকার’ নামক জাহান্নামে, সাকার তাদেরকে জীবিতাবস্থায় রাখবে না এবং মৃত অবস্থায় ছেড়েও দিবে না, গাত্রচর্ম দগ্ধ করবে, তারা ভোগ করবে জাহান্নামের শাস্তি, ভোগ করবে দহন যন্ত্রণা, সাকারের তত্ত্বাবধানে রয়েছে উনিশজন প্রহরী।    

বিভিন্ন হাদিসে জাহান্নামের শাস্তির ধরণ এবং জাহান্নাম থেকে ভীতি প্রদর্শন করা হয়েছে। বুখারী শরীফে আনাস ইব্‌নে মালিক (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন নবী (সা.) প্রায়ই দো’য়া করতেন, “হে আমাদের রব্ব, আমাদেরকে দুনিয়াতে কল্যাণ দান করুন, আখিরাতে কল্যাণ দান করুন এবং আমাদেরকে আগুনের শাস্তি থেকে রক্ষা করুন (২:২০১)”। 

জাহান্নামের অগুন থেকে বাচুন: জাহান্নামের আগুন এত ভয়াবহ যে রাসুলুল্লাহ (সা.) উম্মাতকে জাহান্নাম থেকে আত্মরক্ষা করার জন্য দান-সাদকা করার জন্য উৎসাহ প্রদান করেছেন; তিনি আগুন থেকে আত্মরক্ষার জন্য নুন্যতম হলেও একটি খেজুর দান করার উপর গুরুত্ব প্রদান করেন। যদি কেউ দান করার জন্য খেজুর না পায়, তবে সে যেন একটি ভাল কথার মাধ্যে হলেও জাহান্নাম থেকে নিজেকে আত্মরক্ষা করে। (বুখারী ও মুসলিম)।

সালাত পরিত্যাগকারীর শাস্তি: যাদের মাথা সালাতের ব্যাপারে ভারী অর্থাৎ সালাতে উদাসীন থাকত জাহান্নামে তাদের মস্তককে পাথর দ্বারা চুর্ণ করা হবে, চুর্ণ করার পর আবার তা পুনঃরায় পূর্বে যা ছিল তা হয়ে যাবে, আবার তা পুনঃরায় চুর্ণ করা হবে; এই ভাবেই শাস্তি চলতেই থাকবে (ইমাম বায্‌যার)। 

যাকাত পরিত্যাগকারীর শাস্তি: যারা দুনিয়ার জীবনে যাকাত দানে বিরত থাকত তারা জাহান্নামে চতুষ্পদ জন্তুর মত ‘দারী ও যাক্কুম’ নামক কাঁটাবৃক্ষ ও জাহান্নামের উত্তপ্ত পাথর চরে-চরে খাবে (ইমাম বায্‌যার)। 

ফিতনার বক্তৃতা প্রদানকারীর শাস্তি: যারা দুনিয়ার জীবনে ফিতনার বক্তৃতা প্রদান করেছে, জাহান্নামে উত্তপ্ত লোহার কাঁচি দ্বারা তাদের ঠোঁট ও জিহবা কাটা হবে; যতবার কাটা হবে, ততবার পূর্বে যেমন ছিল তেমন হয়ে যাবে, এই ভাবেই ঠোঁট ও জিহবা কেটে শাস্তি চলতেই থাকবে। (ইমাম বায্‌যার এই হাদিসটি বর্ণনা করেছেন)। 

জাহান্নাম বলবে, “হে আমার রব্ব, আমার অধিবাসীকে আমার কাছে দিন এবং আমাকে যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, তা পূর্ণ করুন; কেননা আমার জিঞ্জির, বেড়ি, প্রজ্বলিত অগ্নি শিখা, ফুটন্ত পানি, জাহান্নামীদের পুঁজ ও শরীরের ময়লার পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়েছে। 

জাহান্নাম বলবে: হে আমার রব্ব, আমার গভীরতা অনেক বেড়েছে, আমার তাপ তীব্রতর হয়েছে; আমাকে আপনি যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, তা পূর্ণ করুন”। 

আল্লাহ বলবেন, “তোমার জন্য রয়েছে প্রতিটি মুশরিক নর ও মুশরিক নারী, পাপচারী নর ও পাপাচারী নারী এবং প্রত্যেক যালিম ব্যক্তি, যারা বিচার দিবসে হিসাবের প্রতি ঈমান রাখে না”। জাহান্নাম বলবে, “আমি সন্তুষ্ট হয়েছি”। (ইমাম বায্‌যার এই হাদিসটি বর্ণনা করেছেন)।  

আব্দুল্লাহ্‌ ইব্‌নে মাসঊদ (রা.) থেকে আল্লাহ তা’য়ালার বাণী, “(زِدْنَاهُمْ عَذَابًا فَوْقَ الْعَذَبِ بِمَا كَانُواْ يُفْسِدُوْنَ), আমরা তাদের উপর আযাবের উপর আযাব বৃদ্ধি করে দেব (পৃথিবীতে) তাদের অশান্তি সৃষ্টির কারণে (১৬:৮৮)”। 

আব্দুল্লাহ্‌ ইব্‌নে মাসঊদ (রা.) বলেন, “তাদের জন্য অনেক বিচ্ছু বৃদ্ধি করে দেওয়া হবে, সেগুলোর সম্মুখের দাঁত হবে খেজুর গাছের মত; সেই বিচ্ছুগুলি তাদেরকে দংশন করতে থাকবে”। আবূ ইয়া’লা ও হাকিম মাওকুফ সূত্রে হাদিসটি বর্ণনা করেছেন। হাদিসটি বুখারী ও মুসলিমের শর্তানু্যায়ী সহীহ্‌)। 

রেফারেন্স: আল-কুরআন (সুরা:আয়াত) অবলম্বনে: ৩৯:১৬; ৫০:৩০; ৭০:১১-১৭; ৭৪:২৬-৩১; ৭৬:৪; ৭৮:২১-২৫; ৮৫:১০; ৮৭:১২-১৩; ৮৮:৪-৭; ৯০:১৯-২০; ১০১:৮-১১; আত-তারগীব ওয়াত-তারহীব: কিতাবু সিফাতিল জান্নাতী ওয়ান-নার, ৪র্থ খণ্ড, জুন ২০০৫, ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ, পৃষ্ঠা-৪৭৫-৪৮০)।

হে আল্লাহ, তুমিই আমাদের একমাত্র রব্ব, আমরা তোমার নিকট জাহান্নামের ভয়াবহ শাস্তি থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করছি। 

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

জান্নাতী, যারা জান্নাতের প্রবেশ করবে তাদের বৈশিষ্ট্য

জান্নাতীদের বৈশিষ্ট্য হলো তারা ধৈর্যশীল, সত্যবাদী, অনুগত, বিনয়াবনত, গোপন ও প্রকাশ্যে ব্যয়কারী, তাওবাকারী এবং শেষরাতে ক্ষমাপ্রার্থী; তারা তাকওয়া অবলম্বন করে চলে তারা বলে, “হে আমাদের রব্ব, আমরা ঈমান এনেছি, সুতরাং তুমি আমাদের পাপ ক্ষমা কর এবং আমাদিগকে আগুনের  আযাব থেকে রক্ষা কর”।  জান্নাতীদের অন্যতম বৈশিষ্ট্য এই যে তারা সালাত কায়েম করে, যাকাত দেয়, রসুলের প্রতি ঈমান আনে, রসুলদের প্রতি সম্মান করে, আল্লাহকে উত্তম ঋণ প্রদান করে এবং ভালর দ্বারা মন্দ দূরীভূত করে, আল্লাহই তাদের পাপ ক্ষমা করবেন এবং দাখিল করাবেন জান্নাতে।  রাসুলের প্রতি যা অবতীর্ণ হয়েছে তা যখন মু’মিনেরা শ্রবণ করে তখন তারা যে সত্য উপলদ্ধি করেছে তাতে তাদের চক্ষু বিগলিত হয়, তারা বলে, হে আমাদের রব্ব, আমরা ঈমান এনেছি, সুতরাং তুমি আমাদিগকে সাক্ষ্যবহদের মধ্যে তালিকাভুক্ত কর।  আমরা আল্লাহ, রাসুল ও আল-কুরআনে ঈমান এনেছি এবং আমরা প্রার্থনা করি, হে আল্লাহ, তুমি আমাদিগকে সৎকর্মপরায়ণদের অন্তর্ভুক্ত কর; এবং তাদের এই কথার জন্য আল্লাহ তাদের পুরস্কার হিসেবে নির্দিষ্ট করেছেন জান্নাত।  যারা ঈমান আনে, হিজরত করে এবং নিজেদের সম্প...

চোগলখোরের পরিচয় ও পরিণাম

অন্যের কাছে নিজেকে আপন করে তুলতে বা নিজের অবস্থান পাকাপোক্ত করতে বা দুনিয়াবী সুযোগ-সুবিধা লাভে কিংবা ব্যক্তি স্বার্থ চরিতার্থ করতে যে মানুষ একজনের কথা অন্যজনের কাছে বলে বেড়ায়; সে হচ্ছে চোগলখোর। ফেতনা-ফাসাদ ও অসন্তষ্টি সৃষ্টির লক্ষে একজনের কথা অন্যজনের কাছে বলে বেড়ানোই হচ্ছে চোগলখুরি। ইসলামে চোগলখুরিকে গোনাহের কাজ এবং হারাম হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। চোগলখুরীর কারণে মানুষের মাঝে ফেতনা সৃষ্টি হয়। পরস্পরের ভালো সম্পর্ক নষ্ট হয়ে যায়। পারস্পরিক দুশমনি বৃদ্ধি পায়। হিংসা-বিদ্বেষ ও শত্রুতা সৃষ্টি হয়। এ কারণেই চোগলখোর বেহেশতে প্রবেশ করতে পারবে না বলে ঘোষণা দিয়েছেন স্বয়ং প্রিয় নবি। চোগলখুরির পরিচয় হজরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, সাবধান! আমি তোমাদেরকে জানাচ্ছি চোগলখুরি কী? এ হচ্ছে কুৎসা রটনা করা; যাতে মানুষের মাঝে বৈরিতার সৃষ্টি হয়। তিনি আরো বলেছেন, কোনো ব্যক্তি সত্য কথা বলতে বলতে সত্যবাদী হিসেবে লিপিবদ্ধ হয়; আবার কেউ মিথ্যা বলতে বলতে মিথ্যাবাদী হিসেবে লিপিবদ্ধ হয়।’ কুরআনুল কারিমে আল্লাহ তাআলা চোগলখোরদের নিন্দা...

মহান আল্লাহ - তিনি বৈশিষ্ট্য মণ্ডিত সত্তা

সর্বোজ্ঞ-প্রজ্ঞাময় আল্লাহ কিয়ামতের দিন উপস্থিত হবেন এবং জান্নাতীদের সাথে কথা বলবেন; আল-কুরআন ও হাদীসে বর্ণিত আল্লাহর মুখ-চেহারা, হাত, পা, চোখ, কান, আঙ্গুল ও নাফস আছে; এসব তথ্যের উপর ভিত্তি করে মুসলিমদের একটি দল বিশ্বাস করেন, যেহেতু আল্লাহকে দেখা যাবে সেহেতু আল্লাহর একটি নির্দিষ্ট আকার (Size) আছে; তাদের মতে “আকারযুক্ত বস্তু দেখা যায় এবং নিরাকার বস্তু দেখ যায় না”। তারা বলেন যে, আল্লাহর এই আকার তাঁর মহান জাতসত্তা ও মহান মর্যাদার সাথে শোভনীয় এবং মানানসই; তারা আরো বলেন যে, আল্লাহর আকার তাঁর সৃষ্ট কোন বস্তুর আকার ও আকৃতির মত নয়। “নিরাকার কোন বস্তুকে দেখা যায় না” এই ধারণার উপর ভিত্তির করেই মুসলিমেদের এই দলটি “আল্লাহর আকার আছে” এই বিশ্বাস লালন করেন।  মুসলিমদের দ্বিতীয় দলটি মনে করেন যে “আল্লাহ নিরাকার অর্থাৎ আল্লাহর কোন আকার নেই”। আল্লাহর চেহারা-মুখ, হাত, পা, চোখ, কান, আঙ্গুল, নাফস ইত্যাদির যে বর্ণনা কুরআনে ও হাদীসে আছে তা মূলত আল্লাহর অনুপম শক্তির বহিঃপ্রকাশ। আল্লাহর অঙ্গ ও প্রত্যঙ্গের উল্লেখ করার সময় এই দ্বিতীয় দলটি এইভাবে বলেন যে, আল্লাহ‌র ক্বুদরতি হাত, ক্বুদরতি পা, ক্বুদরতি চোখ, ক্বুদরত...

নিজ ঘরে যে নামাজ আদায়ে রয়েছে কল্যাণ

  নামাজ ইসলামের অন্যতম প্রধান ইবাদত। ঈমানের পরেই যা পালনীয়। একজন মানুষের ঈমানের স্বীকৃতি দেয়ার পর প্রথম ইবাদত হলো নামাজ আদায় করা, যা ইসলামের দ্বিতীয় রোকন। কুরআন এবং হাদিসে একাধিকবার নামাজ আদায়ের নির্দেশ এবং ফজিলত বর্ণনা করা হয়েছে। মুসলিম উম্মাহর জন্য তা পালনে রয়েছে দুনিয়ার কল্যাণ এবং আখেরাতের মুক্তি। এ কারণে প্রিয়নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ফরজ নামাজ আদায়ের সঙ্গে সঙ্গে বেশি বেশি সুন্নত ও নফল নামাজ এবং এ নামাজের মাধ্যমে বেশি বেশি সেজদা আদায়ের নসিহত পেশ করেছেন। নামাজের জামাআতের ব্যাপারে রয়েছে জোর তাগিদ। আবার নফল ও সুন্নাত নামাজ নিজ ঘরে আদায়েরও রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ ফজিলত। দুনিয়ার কল্যাণ এবং পরকালের মুক্তিতে নফল নামাজ আদায়ের বিকল্প নেই। হাদিসে এসেছে- হজরত জাবের রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘তোমাদের কেউ যখন মসজিদে (ফরজ) নামাজ সম্পন্ন করে তখন তার উচিত সে যেন তার নামাজের কিছু অংশ (সুন্নাত নামাজ) নিজের বাড়ির জন্য রাখে। কারণ বাড়িতে আদায় করা কিছু নামাজের মধ্যে আল্লাহ তাআলা কল্যাণ নিহিত রেখেছেন।’ (মুসলিম) হজরত যায়েদ বিন সাবেত রাদিয়...